Home

সুন্দরবনের দুই পথিকৃৎ: মোহাম্মদ হাসান মনসুর ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু — যাঁরা বিশ্বকে চেনালেন এই বন

Jun 24, 2026· 1 views
সুন্দরবনের দুই পথিকৃৎ: মোহাম্মদ হাসান মনসুর ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু — যাঁরা বিশ্বকে চেনালেন এই বন

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন আজ বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে একটি অপরিহার্য গন্তব্য। UNESCO ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইরাবতী ডলফিন এবং অসংখ্য বিরল প্রজাতির আবাসস্থল। তবে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একদিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দুইজন অসাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, দূরদর্শিতা এবং সুন্দরবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ হাসান মনসুর, যিনি বাংলাদেশের বেসরকারি পর্যটন শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত, এবং নজরুল ইসলাম বাচ্চু, যিনি আন্তর্জাতিক মহলে সুন্দরবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত।

মোহাম্মদ হাসান মনসুরের পর্যটনজীবন শুরু হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। সুইডিশ ট্যুর কোম্পানি LAS och RES-এ প্রায় এক দশক কাজ করার মাধ্যমে তিনি বিশ্বমানের পর্যটন ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৮৮-৮৯ সালে মাত্র তিনজন কর্মী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন The Guide Tours Limited, যা বাংলাদেশের প্রথম নিবন্ধিত ট্যুর অপারেটর হিসেবে TOAB-এর সদস্য নম্বর ১ লাভ করে। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং বর্তমানে সেখানে ৯৫ জনেরও বেশি কর্মী কাজ করছেন।

১৯৯৫ সাল থেকে হাসান মনসুর সুন্দরবনে নিয়মিত ক্রুজভিত্তিক পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। M.L. Bonbibi, M.V. Chhuti এবং M.V. Aboshar নামের তিনটি জাহাজের মাধ্যমে তিনি সুন্দরবনে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল ইকোট্যুরিজমের ভিত্তি স্থাপন করেন। বিশেষ করে M.V. Aboshar সুন্দরবনের লাক্সারি পর্যটনের নতুন যুগের সূচনা করে। তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তাই নন, বরং জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ও শিল্প উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। TOAB-এর সাবেক সভাপতি হিসেবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বাংলাদেশের পর্যটনকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে অবদান রেখেছেন।

অন্যদিকে, নজরুল ইসলাম বাচ্চুর জীবন সুন্দরবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বন বিভাগের একজন কর্মীর সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি সুন্দরবনের পরিবেশ, বন্যপ্রাণী এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৯১ সালে তিনি The Guide Tours Limited-এ শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন এবং হাসান মনসুরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করেন। কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি পরবর্তীতে সুন্দরবন অপারেশন ম্যানেজার এবং পরে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে উন্নীত হন।

নজরুল ইসলাম বাচ্চুর অন্যতম বড় অবদান হলো আন্তর্জাতিক ডকুমেন্টারি ও গবেষণা অভিযানে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। BBC-এর Swamp Tigers, Discovery-এর In Search of Man-eaters, National Geographic-এর Ganges এবং Showtime TV-এর Man-Eating Tigers of the Sundarbans-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করেন। তাঁর দক্ষতা ও জ্ঞান আন্তর্জাতিক গবেষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কাছে সুন্দরবনকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।

২০১০ সালে তিনি Pugmark Tours and Travels প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ছিল সুন্দরবনে বিশেষায়িত ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান। গবেষক, পাখিপ্রেমী, আলোকচিত্রী, কূটনীতিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য তিনি কাস্টমাইজড ট্যুর পরিচালনা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ছোট আকারের বিশেষ নৌযানগুলো সুন্দরবনের সরু খাল ও দুর্গম অঞ্চলে প্রবেশ করতে সক্ষম, যা পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে।

বর্তমানে সুন্দরবন পর্যটন একটি নতুন সম্ভাবনার যুগে প্রবেশ করেছে। USAID ও Solimar International-এর সহায়তায় প্রণীত ২০২৫–২০৪৫ ইকোট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান সুন্দরবনের টেকসই উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রদান করেছে। সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটন, পেশাদার ইকো-গাইড তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণের মাধ্যমে এই খাতকে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং চোরাশিকারের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

হাসান মনসুর এবং নজরুল ইসলাম বাচ্চুর গল্প মূলত একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ও একজন বাস্তবায়নকারীর গল্প। একজন বাংলাদেশের ইকোট্যুরিজম শিল্পের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন, আর অন্যজন সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সুন্দরবনকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁদের সম্মিলিত অবদান শুধু সুন্দরবন পর্যটন নয়, বরং বাংলাদেশের পর্যটন ইতিহাসেরও এক অনন্য ও অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Comments (0)

Please sign in to comment.

Related